বিজ্ঞানের শক্তি, সভ্যতার দ্বন্দ্ব এবং উন্নয়নের প্রকৃত মানদণ্ড


মানবসভ্যতার ইতিহাসে বিজ্ঞানের অবদান নিয়ে আলোচনা করতে গেলে দুটি সত্য একই সঙ্গে মনে রাখা প্রয়োজন। প্রথমত, বৈজ্ঞানিক জ্ঞান ও তার প্রয়োগ মানুষের জীবনকে অভূতপূর্বভাবে বদলে দিয়েছে। টিকা, অ্যান্টিবায়োটিক, ইনসুলিন, নিরাপদ অস্ত্রোপচার, উন্নত রোগনির্ণয়, কৃষিপ্রযুক্তি এবং যোগাযোগব্যবস্থা অসংখ্য মানুষের জীবন রক্ষা করেছে, রোগের কষ্ট কমিয়েছে এবং জ্ঞান অর্জনের সুযোগ বাড়িয়েছে। দ্বিতীয়ত, এই জ্ঞান ও প্রযুক্তির সাহায্যেই মানুষ এমন অস্ত্র তৈরি করেছে, শিল্পব্যবস্থা গড়ে তুলেছে এবং প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহার করেছে, যার কিছু প্রয়োগ ব্যাপক প্রাণহানি, পরিবেশদূষণ ও দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ক্ষতির কারণ হয়েছে। এই দুই বাস্তবতার মধ্যে যেকোনো একটিকে বাদ দিলে বিজ্ঞানের সামাজিক ভূমিকা সম্পর্কে আমাদের ধারণা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।

তবে এখানেই একটি মৌলিক পার্থক্য জরুরি: বিজ্ঞান, প্রযুক্তি এবং প্রযুক্তি ব্যবহারের সিদ্ধান্ত এক জিনিস নয়। বিজ্ঞান হলো পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষা, প্রমাণ ও সংশোধনের মাধ্যমে প্রকৃতি সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য জ্ঞান অর্জনের পদ্ধতি। প্রযুক্তি সেই জ্ঞানের ব্যবহারিক প্রয়োগের একটি উপায়। আর কোন প্রযুক্তি তৈরি হবে, কার প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে, কী কাজে সেটি ব্যবহৃত হবে এবং তার ক্ষতির দায় কে নেবে, এসব প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত থাকে রাজনীতি, অর্থনীতি, সামাজিক মূল্যবোধ, ক্ষমতা ও নৈতিকতা। তাই কোনো প্রযুক্তির ক্ষতিকর ব্যবহার দেখিয়ে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিকেই অনৈতিক বলা যেমন যথাযথ নয়, তেমনি কোনো প্রযুক্তির উপকার দেখিয়ে তার সব ব্যবহারকে কল্যাণকর বলাও যুক্তিসংগত নয়।

জীবন রক্ষার জ্ঞান এবং জীবন ধ্বংসের প্রযুক্তি

চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতি বিজ্ঞানের ইতিবাচক সম্ভাবনার একটি স্পষ্ট উদাহরণ। ইনসুলিনের আবিষ্কার ও পরবর্তী উন্নয়ন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত বহু মানুষের জীবন রক্ষার সুযোগ তৈরি করেছে। টিকা সংক্রামক রোগ প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। আধুনিক রোগনির্ণয় ও জরুরি চিকিৎসা অনেক ক্ষেত্রে মৃত্যুঝুঁকি কমাতে পারে। এসব অর্জনকে কেবল প্রযুক্তিগত সাফল্য হিসেবে দেখলে চলবে না; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে গবেষক, চিকিৎসক, নার্স, ওষুধ প্রস্তুতকারী, স্বাস্থ্যকর্মী, শ্রমিক এবং জনস্বাস্থ্যব্যবস্থার সম্মিলিত অবদান।

কিন্তু একই মানবসভ্যতা পারমাণবিক অস্ত্রও তৈরি করেছে। আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটি (ICRC) জানিয়েছে, জনবসতিপূর্ণ এলাকায় পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্ফোরণ ব্যাপক প্রাণহানি, তীব্র তাপজনিত আঘাত, বিকিরণজনিত অসুস্থতা, অবকাঠামো ধ্বংস এবং দীর্ঘমেয়াদি মানবিক সংকট সৃষ্টি করতে পারে। ১৯৪৫ সালে হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে বোমা হামলা এর ঐতিহাসিক উদাহরণ।
সূত্র: ICRC — পারমাণবিক অস্ত্রবিষয়ক প্রশ্নোত্তর (https://www.icrc.org/en/article/faq-nuclear-weapons)

এখানে মূল শিক্ষা এই নয় যে চিকিৎসাবিজ্ঞান ও অস্ত্রপ্রযুক্তির নৈতিক মূল্য সমান। বরং শিক্ষা হলো, মানুষের জ্ঞান ও দক্ষতা নিজে থেকে মানবিক উদ্দেশ্য নিশ্চিত করে না। বৈজ্ঞানিক জ্ঞান জীবন রক্ষার কাজে ব্যবহৃত হবে, নাকি ব্যাপক ধ্বংসের কাজে, তা নির্ভর করে মানুষ ও প্রতিষ্ঠানগুলোর সিদ্ধান্তের ওপর। ফলে বিজ্ঞানের অগ্রগতি মূল্যায়নে আবিষ্কারের সংখ্যা গোনার পাশাপাশি তার ব্যবহার, পরিণতি এবং জবাবদিহিও বিচার করা প্রয়োজন।

উন্নয়নের লাভ কার, আর ক্ষতির দায় কার?

শিল্পায়ন, বিদ্যুৎ, পরিবহন এবং আধুনিক উৎপাদনব্যবস্থা মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বিদ্যুৎ হাসপাতালের যন্ত্রপাতি চালায়, শিল্পে উৎপাদন সম্ভব করে, শিক্ষার সুযোগ বাড়ায় এবং ঘরের কাজ সহজ করে। কিন্তু বিদ্যুৎ উৎপাদন বা শিল্পকারখানার কিছু পদ্ধতি বায়ুদূষণ ও গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণও বাড়াতে পারে। এই ক্ষতির পরিণতি সব সময় সেই প্রতিষ্ঠানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, যে প্রতিষ্ঠান উৎপাদন থেকে লাভবান হয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) হিসাবে, ২০১৯ সালে বাইরের বায়ুদূষণকে বিশ্বজুড়ে আনুমানিক ৪২ লাখ অকালমৃত্যুর কারণ বলে ধরা হয়েছে। ঘরের ও বাইরের বায়ুদূষণের সম্মিলিত প্রভাবের সঙ্গে বছরে প্রায় ৬৭ লাখ অকালমৃত্যু যুক্ত বলে সংস্থাটি উল্লেখ করেছে। এগুলো জনসংখ্যাভিত্তিক স্বাস্থ্যঝুঁকি ও মৃত্যুর বৈজ্ঞানিক অনুমান; প্রতিটি মৃত্যুর একমাত্র কারণ বায়ুদূষণ, এমন দাবি নয়।
সূত্র: WHO — Ambient (outdoor) air quality and health (https://www.who.int/news-room/fact-sheets/detail/ambient-(outdoor)-air-quality-and-health)

এই বাস্তবতা অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা সামনে আনে: বহিঃপ্রভাব বা externality। কোনো পণ্য উৎপাদনের আর্থিক খরচ ও বাজারমূল্যে যদি দূষণ, অসুস্থতা কিংবা পরিবেশগত ক্ষতির পুরো মূল্য প্রতিফলিত না হয়, তাহলে পণ্যটির দাম তার প্রকৃত সামাজিক খরচের তুলনায় কম দেখায়। উদাহরণস্বরূপ, একটি কারখানা উৎপাদন বাড়িয়ে লাভ করতে পারে, অথচ আশপাশের মানুষকে দূষিত বাতাসে শ্বাস নিতে হয় কিংবা দূষিত পানির কারণে অতিরিক্ত স্বাস্থ্যঝুঁকি বহন করতে হয়। এ ক্ষেত্রে উৎপাদনের সুবিধা ও ক্ষতির বোঝা ভিন্ন মানুষের ওপর পড়ে।

অবশ্য সব শিল্পপ্রতিষ্ঠান একই মাত্রায় দূষণ করে না, আর সব প্রযুক্তির পরিবেশগত প্রভাবও এক নয়। পরিচ্ছন্ন জ্বালানি, দূষণ নিয়ন্ত্রণ, উন্নত উৎপাদনপ্রক্রিয়া এবং কার্যকর আইন একই অর্থনৈতিক কার্যক্রমের ক্ষতি কমাতে পারে। অতএব, সমস্যাটি শুধু শিল্পায়ন নয়; বরং কোন পদ্ধতিতে শিল্পায়ন হচ্ছে, তার খরচ কীভাবে হিসাব করা হচ্ছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের অধিকার কতটা সুরক্ষিত, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

সম্পদ আহরণ বাড়লেই কি মানুষের কল্যাণ বাড়ে?

আধুনিক কৃষি, সেচ, সার, যন্ত্রপাতি ও উন্নত বীজ খাদ্য উৎপাদনে বড় ভূমিকা রেখেছে। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্যচাহিদা পূরণে এসব প্রযুক্তির গুরুত্ব অস্বীকার করার সুযোগ নেই। একই সঙ্গে অতিরিক্ত সার ও কীটনাশকের ব্যবহার, ভূগর্ভস্থ পানির অনিয়ন্ত্রিত উত্তোলন, মাটির অবক্ষয় এবং প্রাকৃতিক আবাসস্থল ধ্বংসের মতো সমস্যাও দেখা দিতে পারে। এসব ক্ষতি প্রতিটি কৃষিপ্রযুক্তির অনিবার্য ফল নয়; অনেক ক্ষেত্রে এগুলো নির্ভর করে প্রযুক্তি কীভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে, কী ধরনের নিয়ন্ত্রণ আছে এবং কৃষকদের কী বিকল্প দেওয়া হচ্ছে তার ওপর।

জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচি (UNEP) ও ইন্টারন্যাশনাল রিসোর্স প্যানেলের Global Resources Outlook 2024 প্রতিবেদন অনুসারে, গত পাঁচ দশকে পৃথিবীর প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণ তিন গুণ হয়েছে। জরুরি ও সমন্বিত পদক্ষেপ না নিলে ২০২০ সালের তুলনায় ২০৬০ সালে সম্পদ আহরণ ৬০ শতাংশ বাড়তে পারে বলে প্রতিবেদনে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। এটি নিশ্চিত ভবিষ্যৎ নয়; বর্তমান প্রবণতার ভিত্তিতে করা একটি পূর্বাভাস, যা নীতি ও উৎপাদনব্যবস্থার পরিবর্তনের মাধ্যমে বদলানো সম্ভব।
সূত্র: UNEP — Global Resources Outlook 2024 (https://www.unep.org/resources/global-resource-outlook-2024)

এই তথ্য উন্নয়নের প্রচলিত ধারণা নিয়ে প্রশ্ন তোলার যথেষ্ট কারণ দেয়। মোট উৎপাদন, বিক্রি বা অবকাঠামো বাড়া অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পরিমাণ বোঝাতে পারে, কিন্তু তা একাই মানুষের সামগ্রিক কল্যাণের পূর্ণ পরিমাপ নয়। উন্নয়ন বিচার করতে হলে আয় ও কর্মসংস্থানের পাশাপাশি স্বাস্থ্য, নিরাপদ পানি, পরিষ্কার বাতাস, শিক্ষার সুযোগ, জীববৈচিত্র্য এবং পরিবেশগত ঝুঁকিও বিবেচনায় নিতে হবে।

একটি বন কেটে ভবন নির্মাণ করলে জমির আর্থিক মূল্য বাড়তে পারে, কিন্তু সেই বনের আবাসস্থল, মাটির সুরক্ষা, পানি ধারণের ভূমিকা এবং জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি হতে পারে। আবার পরিকল্পিত নগরায়ণ, গণপরিবহন ও পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো মানুষের জীবন সহজ করার পাশাপাশি ক্ষতিও কমাতে পারে। তাই প্রশ্নটি উন্নয়ন বনাম প্রকৃতি, এমন সরল দ্বন্দ্ব নয়। প্রশ্ন হলো, কোন উন্নয়ন মানুষের প্রয়োজন মেটায়, কতটা পরিবেশগত ক্ষতি ঘটায় এবং সেই ক্ষতি এড়ানো বা কমানোর বাস্তবসম্মত সুযোগ কতটা কাজে লাগানো হচ্ছে।

জলবায়ু পরিবর্তন: প্রমাণ, ঝুঁকি ও সতর্কতা

মানবসৃষ্ট গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ পৃথিবীর উষ্ণতা বৃদ্ধির প্রধান কারণ। জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক আন্তঃসরকারি প্যানেল (IPCC)-এর মূল্যায়ন অনুযায়ী, বহু অঞ্চলে ভারী বৃষ্টিপাতের ঘটনা বেড়েছে এবং বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে ভারী বৃষ্টিপাতের তীব্রতা বাড়ার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি শক্তিশালী। তবে বৃষ্টিপাত, নদীর প্রবাহ, ভূমিধস ও বন্যা একাধিক ভৌগোলিক এবং মানবসৃষ্ট কারণের ওপর নির্ভর করে। তাই প্রতিটি বন্যাকে জলবায়ু পরিবর্তনের সরাসরি ফল বলা বৈজ্ঞানিকভাবে যথার্থ নয়।
সূত্র: IPCC — AR6 Working Group I, Chapter 11 (https://www.ipcc.ch/report/ar6/wg1/chapter/chapter-11/)

২০২৬ সালের ১১ অক্টোবর নেপালের গোরখা জেলায় বুড়ি গণ্ডকী নদীতে আকস্মিক বন্যার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সমন্বিত পার্বত্য উন্নয়ন কেন্দ্র (ICIMOD)-এর প্রাথমিক বিশ্লেষণে ভূমিধসের কারণে নদীতে অস্থায়ী বাধ সৃষ্টি এবং পরে সেই বাধ ভেঙে যাওয়াকে সম্ভাব্য কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। সংস্থাটি তখনকার তথ্যকে প্রাথমিক বলে উল্লেখ করেছিল। ফলে এই নির্দিষ্ট ঘটনাকে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঘটেছে বলে নিশ্চিতভাবে উপস্থাপন করা ঠিক হবে না।
সূত্র: ICIMOD — ১১ অক্টোবরের বিবৃতি (https://www.icimod.org/press-releases/landslide-dam-breach-may-have-triggered-budhi-gandaki-flash-flood/)

তবে কোনো নির্দিষ্ট দুর্যোগের তাৎক্ষণিক কারণ সম্পর্কে অনিশ্চয়তা থাকা মানে জলবায়ু পরিবর্তনের সামগ্রিক প্রভাব নিয়ে সন্দেহ করার কারণ তৈরি হওয়া নয়। একটি ঘটনা কেন ঘটেছে, জলবায়ু পরিবর্তন তার সম্ভাবনা বা তীব্রতা কতটা বদলেছে এবং ভবিষ্যতে একই ধরনের ঝুঁকি কীভাবে কমানো যায়, এগুলো আলাদা বৈজ্ঞানিক প্রশ্ন। এই পার্থক্য বজায় রাখলেই পরিবেশগত বিপদ নিয়ে আলোচনা আবেগনির্ভর অভিযোগের বদলে প্রমাণভিত্তিক বিশ্লেষণে পরিণত হয়।

বিজ্ঞান এখানে সমাধানেরও গুরুত্বপূর্ণ উপায়: উপগ্রহ পর্যবেক্ষণ, আবহাওয়ার পূর্বাভাস, নদী ও ঢালের ঝুঁকি নিরূপণ, আগাম সতর্কবার্তা এবং নিরাপদ অবকাঠামো পরিকল্পনা মানুষের প্রাণহানি কমাতে পারে। কিন্তু তথ্য থাকা আর সেই তথ্য অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া এক বিষয় নয়। সতর্কবার্তা পৌঁছানো, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নির্মাণ নিয়ন্ত্রণ, স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে প্রস্তুত করা এবং দুর্যোগের পর দ্রুত সহায়তা দেওয়ার জন্য প্রশাসনিক সক্ষমতা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছাও প্রয়োজন।

মানুষ ছাড়াও জীবনের মূল্য আছে কি?

প্রযুক্তিগত উন্নয়নের আরেকটি নৈতিক দিক হলো অন্যান্য প্রাণীর প্রতি মানুষের আচরণ। আধুনিক পশুপালন ও খাদ্য উৎপাদনব্যবস্থা মানুষের পুষ্টি, খাদ্যনিরাপত্তা এবং জীবিকার সঙ্গে যুক্ত। একই সঙ্গে প্রাণীদের ব্যথা, ভয়, চলাফেরার সুযোগ, স্বাভাবিক আচরণ এবং জীবনযাপনের পরিবেশ কেমন, এসব প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। উৎপাদনশীলতা বাড়লেই প্রাণীকল্যাণ নিশ্চিত হয় না।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO) স্বীকার করে যে প্রাণিজ খাদ্য উৎপাদন খাদ্যনিরাপত্তা ও জীবিকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও পশুপালন খাতের ভূমি, পানি, মাটি, বায়ু ও জীববৈচিত্র্যের ওপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব রয়েছে। সংস্থাটি আরও টেকসই উৎপাদনব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তার কথা বলে।
সূত্র: FAO — Livestock and the Environment (https://www.fao.org/livestock-environment/en)

এখানে বাস্তবসম্মত আলোচনা প্রয়োজন। সব প্রাণিজ খাদ্য উৎপাদনব্যবস্থার পরিবেশগত প্রভাব এক নয়; একইভাবে সব মানুষের খাদ্যাভ্যাস, আয় ও পুষ্টির বিকল্পও এক নয়। তাই নৈতিক প্রশ্ন তোলার অর্থ মানুষের পুষ্টি ও জীবিকার বাস্তবতা অস্বীকার করা নয়। বরং প্রাণীদের অপ্রয়োজনীয় কষ্ট কমানো, খাদ্যের অপচয় হ্রাস করা, উৎপাদনের পরিবেশগত খরচ কমানো এবং যেখানে সম্ভব পুষ্টিকর বিকল্পের সুযোগ বাড়ানো, এসব লক্ষ্য একসঙ্গে বিবেচনা করা যায়।

প্রযুক্তি, ক্ষমতা এবং দায়বদ্ধতা

ডিজিটাল প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা জ্ঞান অর্জন, যোগাযোগ, চিকিৎসা ও উৎপাদনে নতুন সুযোগ তৈরি করছে। একই প্রযুক্তি ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহার, প্রতারণা, নজরদারি, ভুল তথ্য ছড়ানো কিংবা বৈষম্যমূলক সিদ্ধান্তের ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে। এই দ্বিমুখী বাস্তবতা থেকে প্রযুক্তি প্রত্যাখ্যানের সিদ্ধান্ত স্বয়ংক্রিয়ভাবে আসে না; আবার নতুন প্রযুক্তি তৈরি হয়েছে বলেই সেটিকে নিঃশর্তে গ্রহণ করাও যুক্তিযুক্ত নয়।

প্রয়োজন প্রযুক্তির নির্ভরযোগ্যতা পরীক্ষা, সম্ভাব্য ক্ষতির মূল্যায়ন, ব্যক্তিগত গোপনীয়তার সুরক্ষা, স্বচ্ছ সিদ্ধান্তপ্রক্রিয়া এবং ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ। বিশেষ করে স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, ঋণ বা সরকারি সেবার মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার ভুল সিদ্ধান্ত মানুষের জীবনে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। তাই দক্ষতা বাড়ানোর পাশাপাশি ভুল শনাক্ত করা এবং দায় নির্ধারণের ব্যবস্থাও থাকা দরকার।

আরেকটি প্রশ্ন হলো, প্রযুক্তির সুবিধা ও ক্ষতি কারা বহন করছে। উন্নত চিকিৎসা, নিরাপদ বাসস্থান এবং দূষণ থেকে সুরক্ষা পাওয়ার সুযোগ সবার সমান নয়। একইভাবে শিল্পের লাভ, পরিবেশগত ক্ষতি এবং ঝুঁকিপূর্ণ কাজের বোঝাও সব মানুষের ওপর সমানভাবে পড়ে না। এই বৈষম্য প্রযুক্তির নিজস্ব বৈশিষ্ট্য দিয়ে পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা যায় না; এর সঙ্গে সম্পদ বণ্টন, শ্রমিকের অধিকার, সরকারি নীতি, বাজারের কাঠামো এবং সামাজিক ক্ষমতার সম্পর্ক জড়িত।

এ কারণে প্রযুক্তির নৈতিক মূল্যায়ন শুধু উদ্ভাবকের উদ্দেশ্য দেখে করা যথেষ্ট নয়। কোনো ব্যক্তি ভালো উদ্দেশ্যে কাজ করলেও বৃহত্তর ব্যবস্থার ফল ক্ষতিকর হতে পারে। আবার সঠিক নীতি, নিয়ন্ত্রণ ও প্রণোদনা থাকলে একই প্রযুক্তি অনেক বেশি মানুষের উপকারে আসতে পারে। ব্যক্তির সততা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু প্রতিষ্ঠান ও ব্যবস্থার জবাবদিহি তার বিকল্প নয়।

তাহলে অগ্রগতির মানদণ্ড কী হওয়া উচিত?

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অর্জন মূল্যায়নের জন্য একটিমাত্র মানদণ্ড যথেষ্ট নয়। উৎপাদন, আয়, চিকিৎসার সুযোগ, মানুষের আয়ু, শিক্ষার প্রসার ও যোগাযোগের উন্নতি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। পাশাপাশি দেখতে হবে, এসব অর্জনের জন্য কী ধরনের পরিবেশগত মূল্য দিতে হচ্ছে, ক্ষতির শিকার কারা হচ্ছেন, প্রাণীদের অপ্রয়োজনীয় কষ্ট কতটা কমানো যাচ্ছে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কী ধরনের পৃথিবী রেখে যাওয়া হচ্ছে।

এর অর্থ এই নয় যে প্রতিটি প্রযুক্তিগত সিদ্ধান্তে সব ঝুঁকি শূন্য করতে হবে। বাস্তব পৃথিবীতে অনেক সিদ্ধান্তেরই সুবিধা ও অসুবিধা আছে। কোনো প্রযুক্তি জীবন বাঁচাতে পারে, আবার তার খরচ বা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও থাকতে পারে। দায়িত্বশীল সিদ্ধান্তের জন্য তাই সম্ভাব্য উপকার, সম্ভাব্য ক্ষতি, বিকল্প পদ্ধতি, অনিশ্চয়তা এবং ক্ষতি কমানোর সুযোগ, সবকিছু তুলনা করতে হয়। প্রমাণ নতুন হলে সিদ্ধান্তও সংশোধন করতে প্রস্তুত থাকতে হয়।

বিজ্ঞানের একটি বড় শক্তি হলো, এটি নিজের ভুল সংশোধনের সুযোগ রাখে। কিন্তু বৈজ্ঞানিক জ্ঞান থেকে ন্যায়সংগত সমাজ স্বয়ংক্রিয়ভাবে তৈরি হয় না। কোন ঝুঁকি গ্রহণযোগ্য, কার স্বার্থ অগ্রাধিকার পাবে এবং ক্ষতি হলে ক্ষতিপূরণ কে দেবে, এসব প্রশ্নের উত্তর নির্ধারণে নৈতিক যুক্তি, জনপরামর্শ, আইন, গণতান্ত্রিক জবাবদিহি ও সামাজিক দায়িত্বের প্রয়োজন রয়েছে।

এই কারণে বিজ্ঞানকে কেবল প্রশংসা বা নিন্দার বিষয় হিসেবে না দেখে, মানুষের বাস্তব জীবন ও বৃহত্তর সমাজে তার ভূমিকা বিশ্লেষণ করা বেশি ফলপ্রসূ। বিজ্ঞান রোগের চিকিৎসা খুঁজে দিতে পারে; কিন্তু সেই চিকিৎসা সবার কাছে পৌঁছাবে কি না, তা নির্ভর করে স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও সম্পদ বণ্টনের ওপর। বিজ্ঞান দূষণ শনাক্ত করতে পারে; কিন্তু দূষণ নিয়ন্ত্রণে আইন প্রয়োগ হবে কি না, তা নির্ভর করে রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের ওপর। বিজ্ঞান জলবায়ুর পরিবর্তন ব্যাখ্যা করতে পারে; কিন্তু নিঃসরণ কমানো এবং দুর্যোগে ঝুঁকিপূর্ণ মানুষকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য সম্মিলিত পদক্ষেপ প্রয়োজন।

সভ্যতার অগ্রগতি তাই শুধু নতুন আবিষ্কারের সংখ্যা দিয়ে মাপা যায় না; আবার ক্ষতিকর প্রযুক্তির অস্তিত্ব দেখিয়ে সব বৈজ্ঞানিক অর্জনকে বাতিল করেও বিচার করা যায় না। যুক্তিসংগত মূল্যায়নের জন্য দেখতে হবে, কোন জ্ঞান কী কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে, তার প্রমাণিত উপকার ও ক্ষতি কী, সেই ফল কীভাবে মানুষের মধ্যে বণ্টিত হচ্ছে এবং ক্ষতি কমানোর জন্য কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি বিজ্ঞান ভালো না খারাপ, এত সরল নয়। প্রশ্ন হলো, মানুষ তার অর্জিত জ্ঞান ও ক্ষমতাকে কী উদ্দেশ্যে ব্যবহার করছে, সেই ব্যবহারের পরিণতির দায় নিচ্ছে কি না, এবং অগ্রগতির সুফল যতটা সম্ভব বিস্তৃত করার পাশাপাশি তার ক্ষতি কমাতে কতটা আন্তরিক। এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বিজ্ঞান যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন নৈতিক বিচার, সামাজিক ন্যায়বোধ, প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি এবং নিজের বিশ্বাসের বিপরীতে থাকা প্রমাণকেও গুরুত্ব দেওয়ার মানসিকতা।



Comments

Popular posts from this blog

Chamois leather -Shammy-শ্যাময়(ভিন্ন বানান - স্যাময়) চামড়া

About Abraham Lincoln(আব্রাহাম লিংকন সম্পর্কে)

সংখ্যার বৈজ্ঞানিক রূপ বা আদর্শ রূপ, নবম-দশম শ্রেণি