বাংলাদেশ কেন দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি ও নাগরিকের মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হচ্ছে?
বাংলাদেশের মানুষের বিদেশে গিয়ে অপমান, নির্যাতন, প্রতারণা ও অমানবিক শ্রমের শিকার হওয়ার পেছনে শুধু দারিদ্র্য বা অশিক্ষা দায়ী নয়। এর পেছনে আছে দুর্বল প্রতিষ্ঠান, অপর্যাপ্ত ভালো চাকরি, নিম্নমানের দক্ষতা প্রশিক্ষণ, দুর্নীতি, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা, নিয়োগব্যবস্থায় দালালের প্রভাব, শ্রমিকের অধিকার রক্ষায় দুর্বলতা এবং আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের বৈষম্য। তবে একটি বিষয় শুরুতেই পরিষ্কার করা দরকার: বিদেশে পরিচ্ছন্নতাকর্মী, নির্মাণশ্রমিক বা গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করা নিজে অসম্মানের নয়; অসম্মানজনক হলো কাউকে প্রতারণা করে বিদেশে পাঠানো, তাঁর পাসপোর্ট আটকে রাখা, মজুরি না দেওয়া, জোর করে কাজ করানো, যৌন নির্যাতন করা কিংবা চাকরি ছাড়ার স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া। বাংলাদেশের সংকট শুধু কম দক্ষতার শ্রমিক রপ্তানি নয়; সংকট হলো, এত বড় শ্রমশক্তি থাকা সত্ত্বেও তাঁদের নিরাপদ, দক্ষতাভিত্তিক ও ভালো বেতনের কর্মসংস্থান এবং কার্যকর আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করতে না পারা।
প্রথম কারণ হলো দুর্বল প্রশাসন, দুর্নীতি এবং আইনের অসম প্রয়োগ। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের ২০২৪ সালের দুর্নীতি ধারণা সূচকে (Corruption Perceptions Index—সিপিআই) বাংলাদেশ ১০০-এর মধ্যে ২৩ পয়েন্ট পেয়েছে এবং ১৮০টি দেশের মধ্যে ১৫১তম অবস্থানে রয়েছে। এই সূচক সরকারি খাতের দুর্নীতি সম্পর্কে বিশেষজ্ঞ ও ব্যবসায়ীদের ধারণা পরিমাপ করে; এটি দেশের প্রতিটি ব্যক্তির দুর্নীতি বা প্রতিটি সরকারি দপ্তরের দুর্নীতির সরাসরি পরিমাপ নয়। তবু এটি গুরুতর প্রাতিষ্ঠানিক সমস্যার একটি সতর্কসংকেত। যখন সরকারি চাকরিতে মেধার বদলে পরিচয়, প্রভাব বা ঘুষ কাজ করে, যখন সরকারি কেনাকাটায় প্রতিযোগিতার বদলে পছন্দের প্রতিষ্ঠান সুবিধা পায়, যখন অপরাধের বিচার রাজনৈতিক পরিচয় অনুযায়ী বদলে যায়, তখন দক্ষ মানুষ ও সৎ ব্যবসায়ী ক্ষতিগ্রস্ত হন। ব্যবসায়ীরা নতুন কারখানা স্থাপন, প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ এবং বেশি কর্মী নিয়োগের বদলে অনিশ্চয়তা ও অনানুষ্ঠানিক খরচ নিয়ে চিন্তিত থাকেন। এর ফলে উৎপাদনশীল চাকরি তৈরির গতি কমতে পারে। সমস্যা শুধু কোনো একটি দলের নয়; যে দলই ক্ষমতায় থাকুক, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, নিরপেক্ষ পুলিশ, কার্যকর দুর্নীতি দমন, স্বাধীন গণমাধ্যম এবং জবাবদিহিমূলক প্রশাসন ছাড়া দুর্নীতির ঝুঁকি থেকে যায়। বিশ্বব্যাংকও ২০২৫ সালে বাংলাদেশের সরকারি ক্রয়, রাজস্ব আদায়, সরকারি বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনা এবং আর্থিক তদারকিতে স্বচ্ছতা বাড়ানোর জন্য প্রতিষ্ঠানগত সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে।
দ্বিতীয় কারণ হলো ব্যাংক খাতে দুর্বল তদারকি এবং ঋণখেলাপির সমস্যা। ব্যাংকের টাকা শুধু মালিক বা পরিচালকের ব্যক্তিগত টাকা নয়; এর বড় অংশ সাধারণ মানুষের আমানত। কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যথাযথ যাচাই ছাড়াই বড় ঋণ নিয়ে ফেরত না দিলে ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা দুর্বল হয়, ফলে সেই অর্থ নতুন শিল্প, কৃষি, ক্ষুদ্র ব্যবসা বা কর্মসংস্থানে ব্যবহার করা কঠিন হয়ে পড়ে। বাংলাদেশ ব্যাংকের Financial Stability Report 2025 অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতের মোট ঋণের ৩০.৬০ শতাংশ খেলাপি হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ ছিল; খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ৫.৫৭ লাখ কোটি টাকা। এত বড় অঙ্কের খেলাপি ঋণ আদায় ও পুনরুদ্ধারে গুরুতর সমস্যার ইঙ্গিত দেয়। তবে সব খেলাপি ঋণ দুর্নীতির ফল, তা বলা যাবে না; ব্যবসায়িক ক্ষতি ও অর্থনৈতিক সংকটেও ঋণ পরিশোধ ব্যাহত হতে পারে। সঠিক সমাধান হলো ঋণ অনুমোদনে স্বচ্ছতা, প্রভাবশালীদের বিশেষ সুবিধা বন্ধ, নিরপেক্ষ নিরীক্ষা, দ্রুত আইনি ব্যবস্থা এবং ব্যাংকের পরিচালনায় পেশাগত যোগ্যতা নিশ্চিত করা। একইভাবে কর ফাঁকি ও অর্থ পাচার ঠেকানো জরুরি। সরকার পর্যাপ্ত কর না পেলে মানসম্মত স্কুল, হাসপাতাল, কারিগরি প্রশিক্ষণ, গবেষণা, গণপরিবহন ও সামাজিক সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় অর্থ ব্যয় করতে পারে না। কিন্তু বিদেশে টাকা পাচারের প্রতিটি অভিযোগকে প্রমাণিত অপরাধ বলা যাবে না; নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নির্ভরযোগ্য নথি, তদন্ত বা আদালতের সিদ্ধান্ত প্রয়োজন।
তৃতীয় কারণ হলো, বাংলাদেশের বিদেশি মুদ্রা আয়ের একটি বড় উৎস শ্রমিকদের রেমিট্যান্স হলেও সেই শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা একই মানে শক্তিশালী হয়নি। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে প্রবাসী আয় এসেছিল প্রায় ৩০.৩২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এই অর্থ পরিবারকে খাবার, শিক্ষা, চিকিৎসা, বাড়িঘর ও ছোট ব্যবসার খরচ চালাতে সাহায্য করে এবং দেশের বৈদেশিক মুদ্রার জোগান বাড়ায়। কিন্তু রেমিট্যান্স আসা মানেই শ্রমিক নিরাপদ আছেন, এমন নয়। কোনো শ্রমিক কয়েক বছর বিদেশে কাজ করেও ঋণ শোধ করতে না পারলে, নির্যাতনের শিকার হলে বা অসুস্থ হয়ে দেশে ফিরলে তাঁর পরিবারের ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি হয়। দূতাবাস ও কনস্যুলার সেবার ক্ষেত্রে অভিযোগ গ্রহণ, জরুরি আশ্রয়, আইনি সহায়তা, নিয়োগকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ, বকেয়া মজুরি আদায়ে সহযোগিতা এবং মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ। এসব সেবার মান দেশ, দূতাবাস, কর্মীর নথিপত্র ও ঘটনার ধরন অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে। তাই "সব দূতাবাস শ্রমিকদের অবহেলা করে"—এমন সাধারণ সিদ্ধান্তের বদলে প্রতিটি দেশের অভিযোগ নিষ্পত্তির সময়, সহায়তা পাওয়া শ্রমিকের সংখ্যা, আইনি ফলাফল এবং সেবার বাজেট প্রকাশ করা উচিত। আইএলওর গবেষণা দেখায়, বাংলাদেশের অভিবাসন ব্যবস্থায় আইনি কাঠামো থাকা সত্ত্বেও নিয়োগ ব্যয়, অনিয়ন্ত্রিত উপদালাল এবং তদারকির ঘাটতি শ্রমিকের সুরক্ষাকে দুর্বল করে।
চতুর্থ কারণ হলো, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণব্যবস্থা অনেক ক্ষেত্রে শ্রমবাজারের প্রয়োজনের সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি। একটি ডিগ্রি থাকা এবং বাস্তবে কাজ করতে পারা এক বিষয় নয়। একজন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় ভালো নম্বর পেলেও ইংরেজিতে কথা বলা, কম্পিউটার ব্যবহার, যন্ত্র পরিচালনা, সমস্যা সমাধান, দলগত কাজ বা বাস্তব পেশাগত দক্ষতায় পিছিয়ে থাকতে পারেন। আবার একজন কারিগরি প্রশিক্ষণার্থী সনদ পেলেও যদি আধুনিক যন্ত্রে কাজ শেখার সুযোগ না পান, তাহলে তাঁর দক্ষতার বাজারমূল্য কম থাকে। এর জন্য শিক্ষার্থীকে একা দায়ী করা যায় না। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মান, শিক্ষকের প্রশিক্ষণ, ল্যাবের সুবিধা, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ, ইন্টার্নশিপ এবং প্রশিক্ষণের ফলাফল যাচাইয়ের দায়িত্বও সরকারের ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের। উদাহরণ হিসেবে, বিদেশে বৈদ্যুতিক কাজ, ওয়েল্ডিং, শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের মেরামত, নার্সিং, প্রবীণদের পরিচর্যা, ভারী যন্ত্র চালানো বা আধুনিক নির্মাণকাজের জন্য নির্দিষ্ট দক্ষতা প্রয়োজন হতে পারে। শুধু বিদেশে পাঠানোর জন্য প্রশিক্ষণ না দিয়ে নিয়োগকর্তার চাহিদা অনুযায়ী দক্ষতা শেখানো, ভাষা পরীক্ষা নেওয়া এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সনদ নিশ্চিত করা দরকার। বিশ্বব্যাংকের ২০২৫ সালের বিশ্লেষণে দক্ষতার ঘাটতি, অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা এবং ব্যবসা পরিচালনার জটিলতাকে বাংলাদেশে ভালো চাকরি তৈরির প্রধান বাধাগুলোর মধ্যে চিহ্নিত করা হয়েছে।
পঞ্চম কারণ হলো, সরকারি প্রতিষ্ঠান আছে, কিন্তু সেবা মানুষের কাছে কতটা কার্যকরভাবে পৌঁছায়, সেটিই আসল প্রশ্ন। প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি), সরকারি নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান বোয়েসেল এবং কারিগরি প্রশিক্ষণকেন্দ্রের মতো প্রতিষ্ঠান রয়েছে। কিন্তু মানুষ যদি স্থানীয় পর্যায়ে সঠিক তথ্য না পান, অনুমোদিত নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান যাচাই করতে না পারেন, প্রকৃত খরচ জানতে না পারেন কিংবা অভিযোগের সমাধান না পান, তাহলে তাঁরা পরিচিত দালালের ওপর নির্ভর করেন। দালাল কখনো বৈধ নিয়োগ প্রক্রিয়ার মধ্যস্থতাকারীও হতে পারেন; কিন্তু অনিয়ন্ত্রিত মধ্যস্থতাকারী, ভুয়া ভিসা, অতিরিক্ত টাকা আদায় এবং মিথ্যা চাকরির প্রতিশ্রুতি বড় ঝুঁকি। আইএলওর ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ-কাতার নির্মাণ খাতে ন্যায্য নিয়োগের একটি পরীক্ষামূলক উদ্যোগে (২০১৮–২০২১) বাংলাদেশি শ্রমিকদের অভিবাসনের গড় ব্যয় ৯২ শতাংশ কমেছিল এবং ওই উদ্যোগের পর নিয়োগ পাওয়া প্রায় ৯৩ শতাংশ শ্রমিক ঋণমুক্ত থাকার কথা জানিয়েছিলেন। এই উদাহরণ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি দেখায় যে সমস্যাটি শুধু মানুষের দারিদ্র্য বা অশিক্ষার কারণে তৈরি হয় না; নিয়োগের নিয়ম বদলানো, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করা এবং জবাবদিহি বাড়ালেও বাস্তব উন্নতি সম্ভব।
ষষ্ঠ কারণ হলো রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা, স্বজনপ্রীতি এবং ক্ষমতার অপব্যবহার। যখন রাজনৈতিক দলের কিছু নেতা বা প্রভাবশালী ব্যক্তি নিজেদের সমর্থক গোষ্ঠীকে অর্থ, পদ, ঠিকাদারি বা বেআইনি সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা করেন, তখন যোগ্যতা ও আইনের বদলে আনুগত্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে চাঁদাবাজি, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, ভয় দেখানো কিংবা অপরাধের বিচার ঠেকানোর ঘটনা ঘটলে সাধারণ নাগরিক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও সৎ চাকরিপ্রার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হন। তবে প্রতিটি রাজনৈতিক কর্মী অপরাধী নন এবং রাজনৈতিক সভা-মিছিল করাও অপরাধ নয়। সমস্যা হলো, রাজনৈতিক পরিচয় যদি আইন ভাঙার সুরক্ষা দেয়, তাহলে প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়। একইভাবে, কোনো রাজনীতিবিদ বা সরকারি কর্মকর্তার পরিবারের সদস্য বিদেশে থাকেন, বিদেশে পড়াশোনা করেন বা বাড়ি কেনেন—শুধু এ কারণে তাঁকে দুর্নীতিবাজ বলা যায় না। কিন্তু সরকারি পদ ব্যবহার করে অবৈধ সম্পদ অর্জন, সম্পদের উৎস গোপন বা অর্থ পাচারের প্রমাণ পাওয়া গেলে তা নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচারের আওতায় আনতে হবে। স্বাধীন নিরীক্ষা, সম্পদের ঘোষণা যাচাই, স্বার্থের সংঘাত নিয়ন্ত্রণ, সরকারি চুক্তির তথ্য প্রকাশ এবং অপরাধ প্রমাণিত হলে শাস্তি নিশ্চিত করা ছাড়া এই চক্র ভাঙা সম্ভব নয়।
সপ্তম কারণ হলো, পরিবার পরিকল্পনা, নারীর শিক্ষা ও কর্মসংস্থান নিয়ে সমাজে ভুল ধারণা এবং অসম সুযোগ। কোনো ধর্মীয় বক্তা বেশি সন্তান নেওয়ার পক্ষে মত দিলেই তিনি সরাসরি দেশের বেকারত্বের কারণ—এমন সিদ্ধান্ত বৈজ্ঞানিকভাবে যথেষ্ট নয়। বাংলাদেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির পেছনে জন্মহার, মৃত্যুহার, পরিবার পরিকল্পনা, নারীর শিক্ষা, শিশুমৃত্যু, আয় ও সামাজিক নিরাপত্তাসহ বহু বিষয় কাজ করে। তবে সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্তে যদি নারীর স্বাধীনতা কম থাকে, জন্মনিয়ন্ত্রণের তথ্য ও সেবা সহজে না পাওয়া যায়, কিংবা পরিবারকে সন্তানসংখ্যা সম্পর্কে অপরাধবোধ বা সামাজিক চাপের মধ্যে রাখা হয়, তাহলে নারী ও শিশুর স্বাস্থ্য এবং পরিবারের অর্থনৈতিক অবস্থার ক্ষতি হতে পারে। অধিক সন্তান মানেই দারিদ্র্য, আবার কম সন্তান মানেই সমৃদ্ধি—কোনোটিই সর্বজনীন সত্য নয়। মূল বিষয় হলো, মানুষ যেন তথ্যভিত্তিক ও স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিতে পারেন এবং প্রতিটি শিশুর জন্য পুষ্টি, স্বাস্থ্যসেবা ও মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা যায়। একই সঙ্গে নারীদের নিরাপদ কর্মসংস্থান, শিশুযত্নের ব্যবস্থা এবং সমান মজুরির সুযোগ বাড়াতে হবে। বিশ্বব্যাংকের ২০২৫ সালের প্রতিবেদনেও তরুণী ও শিক্ষিত নারীদের চাকরির সংকটকে বাংলাদেশের কর্মসংস্থানের বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
অষ্টম কারণ হলো, ইউরোপে যাওয়ার অবৈধ ও বিপজ্জনক পথে প্রতারণা। কিছু মানুষকে ইউরোপে চাকরি বা স্থায়ী জীবনের মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে সীমান্ত পার করানো হয়, বিপজ্জনক নৌযানে তোলা হয় অথবা একাধিক দেশের মধ্য দিয়ে পাচার করা হয়। ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবি, নিখোঁজ হওয়া এবং প্রাণহানির ঘটনা এই ঝুঁকির ভয়াবহতা দেখায়। তবে ইউরোপে যাওয়া সব বাংলাদেশি অবৈধ পথে যান না; অনেকে বৈধ কাজের ভিসা, শিক্ষা, পরিবার পুনর্মিলন বা অন্য অনুমোদিত পথে যান। অবৈধ পথে যাওয়ার পেছনে শুধু ব্যক্তির লোভ নয়, দেশের ভেতরে ভালো চাকরির অভাব, বিদেশে বেশি আয়ের প্রত্যাশা, সামাজিক সাফল্যের চাপ এবং পাচারকারীদের মিথ্যা প্রচারণাও কাজ করে। যখন মানুষ বৈধ পথে বিদেশে যাওয়ার খরচ বহন করতে পারেন না, অথচ দ্রুত বড় আয়ের আশ্বাস পান, তখন তাঁরা ঝুঁকিপূর্ণ প্রস্তাবে রাজি হতে পারেন। এই পরিস্থিতিতে শুধু সীমান্তে আটকানো যথেষ্ট নয়; পাচারকারী চক্রের অর্থের উৎস শনাক্ত করা, ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা দেওয়া, নিরাপদ বৈধ অভিবাসনের সুযোগ বাড়ানো এবং বিদেশে চাকরির যাচাইযোগ্য তথ্য স্থানীয় পর্যায়ে পৌঁছানো প্রয়োজন।
উপসংহার: ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার পর ৫৫ বছর পার হলেও বাংলাদেশের সব ক্ষেত্রে ব্যর্থতা ঘটেছে—এমন সিদ্ধান্তও পুরোপুরি সঠিক নয়। দেশ দারিদ্র্য হ্রাস, শিক্ষা বিস্তার, পোশাকশিল্প, অবকাঠামো এবং প্রবাসী আয়ের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে। কিন্তু উন্নয়ন কতটা ন্যায্য, টেকসই এবং মানুষের মর্যাদা নিশ্চিত করতে সক্ষম, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি যদি যথেষ্ট ভালো চাকরি তৈরি না করে, শিক্ষার মান যদি দুর্বল থাকে, ব্যাংকের অর্থের অপব্যবহার ঠেকানো না যায়, অপরাধের বিচার নিরপেক্ষ না হয় এবং বিদেশে যাওয়া শ্রমিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হয়, তাহলে উন্নয়নের সুফল সীমিত মানুষের হাতে কেন্দ্রীভূত হতে পারে। সমাধান শুধু বেশি মানুষকে বিদেশে পাঠানো নয়; বরং দেশের ভেতরে উৎপাদনশীল চাকরি তৈরি করা, দক্ষতা ও ভাষাশিক্ষা উন্নত করা, নিয়োগ ব্যয় কমানো, প্রতারণার শাস্তি নিশ্চিত করা, দূতাবাসের সেবার ফলাফল প্রকাশ করা, ব্যাংক ও করব্যবস্থায় স্বচ্ছতা বাড়ানো এবং বিচারব্যবস্থা ও প্রশাসনকে রাজনৈতিক প্রভাব থেকে স্বাধীন করা। শ্রমিককে সস্তা শ্রম হিসেবে নয়, অধিকারসম্পন্ন মানুষ হিসেবে দেখতে হবে। বাংলাদেশের মানুষের বিদেশে কাজ করার অধিকার আছে, কিন্তু সেই কাজের জন্য তাঁদের ঋণের ফাঁদে পড়া, প্রতারণার শিকার হওয়া বা অমানবিক পরিবেশে জীবন কাটানো কোনোভাবেই স্বাভাবিক বা গ্রহণযোগ্য নয়।
Comments